মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কের আওতা থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশকে যেন বাদ দেয়া হয়, এমন আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের শুল্ক আরোপ অর্থনৈতিকভাবে নাজুক দেশগুলোর জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ৫৭টি বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো পণ্য ও সেবা বাণিজ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস। এ তালিকায় ক্যামেরুনের মতো দেশও আছে, যেখানে শুল্কহার ১১ শতাংশ। আবার লেসোথোর মতো দেশের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে।
আঙ্কটাড জানিয়েছে, এ ধরনের পাল্টা শুল্ক অনেক দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বিকল্প রাজস্ব উৎস ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায় এমন দেশ ক্ষতির শিকার হবে। ৫৭টি দেশের মধ্যে জাতিসংঘ স্বীকৃত স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়েছে ১১টি দেশ এবং তারা সম্মিলিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বাণিজ্য ঘাটতিতে খুব সামান্য অবদান রাখে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ৫৭ দেশের মধ্যে ২৮টির প্রতিটিই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির মাত্র দশমিক ১ শতাংশেরও কম অংশীদার। তবু তারা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের মুখে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, লেসোথো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির মাত্র দশমিক শূন্য ১৯ শতাংশের জন্য দায়ী। অথচ সেখানে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হচ্ছে।
আঙ্কটাড বলেছে, এরই মধ্যে ক্ষুদ্র ও দুর্বল অর্থনীতির কয়েকটি দেশ ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে। বাণিজ্য ঘাটতির ওপর এসব দেশের প্রভাবও নগণ্য। এ দেশগুলোকে নতুন শুল্ক বৃদ্ধি থেকে অব্যাহতি দেয়া উচিত। সংস্থাটির মতে, এ দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রফতানি বাজার হিসেবে বড় সম্ভাবনা নেই। আবার তাদের দেয়া বাণিজ্য ছাড়ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তেমন মূল্য বহন করে না।
আঙ্কটাডের মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান বলেন, ‘এ দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিযোগিতামূলক হুমকি নয়, নিরাপত্তার ঝুঁকিও নয়, তাদের কেন এ শাস্তি ভোগ করতে হবে? আমরা এমন এক নতুন পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে প্রবৃদ্ধি কম, ঋণের বোঝা বেশি। আমরা উদ্বিগ্ন বিশ্ব অর্থনীতি আরো মন্থর হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর দিকেই আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।’
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা বিশ্বব্যাপী ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও জানান গ্রিনস্প্যান। তার মতে, শেষ পর্যন্ত কী হবে তা জানলে আমাদের কৌশল তৈরি করা সহজ হতো। কিন্তু যদি সবসময়ই পরিস্থিতি বদলায়, তাহলে পরিকল্পনা করাই কঠিন হয়ে পড়ে।’
এদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রধান অর্থনীতিবিদ রালফ অসা সতর্ক করে বলেছেন, শুল্ক শুধু রাজস্ব সংগ্রহ বা অভ্যন্তরীণ শিল্প রক্ষার মাধ্যম নয়, বরং এর রয়েছে বহুমাত্রিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব। স্বল্পমেয়াদে উপকার পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এতে প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক প্রধান শন ডোহার্টি বলেছেন, প্রযুক্তির সাহায্যে ছোট দেশগুলো এ অনিশ্চয়তা মোকাবেলায় কিছুটা সুবিধা পেতে পারে। তার ভাষায়, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অনেক সময় প্রযুক্তিগত বাধা কম থাকে, ফলে তারা তুলনামূলকভাবে দ্রুত প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম হয়।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এ স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ভবিষ্যৎ বাণিজ্য নীতিতে রেহাই দেয়া, যাতে তারা আরো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা না খায়। অন্যথায়, বৈশ্বিক অর্থনীতির দুর্বলতম স্তম্ভগুলো আরো সংকটে পড়ে যেতে পারে।